আজ ৯ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২২শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং

শিউলী সাথীদের শীত-প্রভাত

আঁসকোনা! রাজধানী ঢাকার একটি উল্লেখযোগ্য এলাকা উত্তরায় অবস্থিত। উত্তরার রেলপথ বেঁকে চলেছে আঁসকোনা। দুর্দান্ত এক জনবহুল এলাকা ছিল উত্তরা। আজ থেকে ২১ বছর আগের কথা। আমার আব্বু তৎকালিন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম শ্রেণির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। আমার যখন সাড়ে চার বছর বয়স, তখন আমাকে ভর্তি করে দেওয়া হয় উত্তরার “আল-হুদা” মাদ্রাসায়। অন্য সব ছাত্রদের তুলনায় আমি খুবই ছোটো ছিলাম। আর আমার আব্বু ছিলেন এলাকার একজন সম্মানিত ব্যাক্তি। তাই তার ছেলে হিসেবে আমাকে সবাই খুবই ভালোবাসতো। আমাদের বাড়িওয়ালার পরিবার থেকে শুরু করে সমস্ত ভাড়াটেরাই আমাদের শুভাকাঙ্খি ছিলেন। খুবই স্বাচ্ছন্দ্যে কটিয়েছিলাম দিনগুলো।
সেই সময়ের অতুলনীয় কিছু স্মৃতি এখনো হৃদয়ে গাঁথা আছে। ভাবতে গেলে শিহরণে বুকের মাঝে ভাইব্রেট (কম্পন) মুড চলে আসে। একাগ্র চিত্তে মন হারিয়ে যেতে চায় আমার সেই ছেলেবেলায়। সেই সব দিনের সেই সব স্মৃতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল শীত-প্রভাতের মৃদু আভাস। ভীষণ উদ্দিপ্ত চিত্তে, প্রস্ফুটিত হৃদয়ে, আবেগান্বিত মনোরম পরিবেশ মাতিয়ে উদিত হত চিরচেনা সেই রবি। প্রশ্ন চিহ্নিত আঁখি গগন পানে চেয়ে রইত। একটি লাল বৃত্ত কীভাবে আলোকিত করে রাখে পুরো পৃথিবী? কীভাবে এত ক্ষমতা পেল এই বৃত্তটি? কে দিল এত ক্ষমতা? যিনিই দিয়েছেন তারই বা কত বেশি ক্ষমতা হতে পারে? এই সব প্রশ্ন মনের মাঝে ঘোরাফেরা করত সারাক্ষণ।
ভাবতে ভাবতে আমার সব বন্ধুরা চলে আসত। আমাদের বাড়ির মধ্যে একটি শিউলী ফুল গাছ ছিল। সকাল হলেই আমাদের বাড়ির সব বাচ্চারা এখানে চলে আসতাম ফুল কুড়াতে। কি যে আনন্দের ছিল এই ফুল কুড়ান? তা আজ ভাষায় প্রকাশ করা কষ্টকর। সকলে মিলেই ফুলগুলো ভাগাভাগি করে নিতাম। ছিলনা কোনো বিবাদ। কোনো হিংসা। কোনো দ্বন্দ্ব। ছিল শুধু বন্ধুত্ব। ছিল  ভালবাসা ও অমর প্রীতি। শীতের সকালে ফুল কুড়ান শেষে সেখানে বসেই রোদ পোহাতে পোহাতে একে অপরের সাথে গল্পে লিপ্ত হতাম। গতকাল সারাদিন কে কি মজার মজার কাহিনী করেছে তা শুনতাম আর বলতাম। পরে আমাদের থেকে একটু বয়সে বড় কিছু মানুষী এসে সেই ফুল গুলো দিয়ে মালা গেঁথে দিত। সেগুলো আমরা প্রতিদিন একেকজন করে নিজ নিজ প্রিয় মানুষটিকে উপহার দিতাম। কখনো আম্মু। কখনো আব্বু। কখনো ভাইয়া। কখনো আপু। কখনো মামা। কখনো খালামনি। কিংবা কখনো বন্ধু-বান্ধব। তখন তাঁরা খুবই খুশি হত। আমরাও অত্যান্ত আনন্দে থাকতাম।
আমাদের গুরুজনেরা আমাদের একে অপরের প্রতি এত মিল-ভালবাসা দেখে আমাদের নামকরণ করেছিল “শিউলী সাথী” নামে। এভাবেই শিউলী সাথীদের নিয়ে কেঁটে যেত আমার শীতের সকাল। শিউলী সাথীদের শীত-প্রভাত। সেই থেকে শিউলী ফুল আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ফুল হয়ে আছে। শুধু প্রিয় বললে ভুল হবে, এক প্রকার দুর্বলতাও রয়েছে ফুলটিকে ঘিরে।
এভাবেই কেঁটে গেল আমার ছেলেবেলা। খুবই আনন্দ ভরা মুহুর্ত পাড় করেছি। এখনো মন চায় যেন সেই দিনগুলো পুনরায় ফিরে পেতে। কিন্তু আমি জানি, তা আর হবার নয়।
জীবনের প্রতি টানে ছুটতে ছুটতে আমার সেই ছেলেবেলার ফুল কুড়ান শিউলী সাথীরা সাথী হয়ে আজ আর আমার পাশে নেই। কিন্তু প্রতিক্ষনে ওদের খুব মিস করি। জানিনা, একই ভাবে হয়ত ওরাও আমায় মিস করে। দোয়া করি! যেখানে থাক। যেভাবেই থাক। ভাল থেক। সুখে থেক। এই প্রত্যাশাই সৃষ্টিকর্তার কাছে।

One response to “শিউলী সাথীদের শীত-প্রভাত”

  1. I am not very great with English but I come up this really leisurely to understand.

Leave a Reply

Your email address will not be published.

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap
%d bloggers like this: