আজ ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

আমার মৃত্যুর জন্য হেড স্যার দায়ী!

জেএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহনের সুযোগ করে না দেয়ায় সিলিং ফ্যানে ঝুলন্ত আত্মহত্যার চেষ্টা করে শিক্ষার্থী মাহফুজ হাসান। সে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার আর.এম.এম.পি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। আত্মহত্যার চেষ্টা কালে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচায় তার পরিবারের লোকজন।

পরে মাহফুজ হাসানের পরিবারর লোকজন তার ঘরে তল্লাশি করে, একটি ‘চিরকুট’ উদ্ধার করে। ওই চিরকুটে লেখা রয়েছে, “আমার মৃত্যুর জন্য প্রধান শিক্ষক দায়ী।
এ ঘটনার পর থেকে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার আর.এম.এম.পি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের হেড স্যারের বদলির দাবী করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। ঘটনাটি ঘটেছে গত ৬ আগষ্ট সোমবার সন্ধ্যায়।
এলাকাবাসী ও মাহফুজ হাসানের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়,আসন্ন ২০১৮ সালের জেএসসি পরীক্ষায় কোন রকম টেস্ট পরীক্ষা ছাড়াই প্রথম সাময়িক পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ৫৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে এবার জেএসসি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ থেকে বাদ দিয়েছে। মাহফুজ লালমনিরহাট জেলায় ক্রিকেট খেলায় অল রাউন্ডার খেলোয়ার হিসাবে কৃতিত্ব অর্জন করায় সে বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ পায়। যে কারণে প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় যথারীতি অংশ গ্রহণ করলেও তার ফলাফল সন্তসজনক না থাকায় তাকে জেএসসি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ থেকে বাদ দেয় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
মাহফুজ গত ২ আগষ্ট তারিখ প্রধান শিক্ষক বরাবর এক লিখিত আবেদনে উল্লেখ করে যে,ক্রিকেট খেলোয়ার হিসবে জেলা পর্যায়ে অনুশীলন করার কারণে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারেনি। সে কারণে তার প্রথম সাময়িক পরীক্ষা কিছুটা খারাপ হয়। ঐ আবেদনের সাথে এমন কি একটি অঙ্গীকারনামা ও জমা দিয়েছিল এবং সেখানে উল্লেখ ছিলো যে তাকে জেএসসি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ করে দিলে সে নিশ্চিত জিপিএ-৫ অর্জন করবে। উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুবুজ্জামান আহমেদ লিখিত দেন যে একজন খেলোয়ার হিসেবে মাহফুজকে পরীক্ষা দেয়ার সুযাগ করে দেয়ার জন্য প্রধান শিক্ষক বরাবর আবেদন সুপারিশ করছিলো।
তার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সে ৬ আগস্ট সন্ধ্যায় তুষভান্ডার এলাকায় ভাড়া বাসায় সিলিং ফ্যানের সাথে ফাঁস টানিয়ে আত্মহত্যা করার পথ বেছে নেয়। তার বড় বোন কোন কারনে তাকে খুজে না পাওয়ায় তার শয়ন কক্ষে যায়। তার দরজা বন্ধ থাকায় তার বোন দরজায় লাথি দিয়ে ছিটকিনি ভেঙ্গে রুমে ঢুকে। সে গিয়ে দেখে মাহফুজ মৃত্যু যন্ত্রনায় ফাঁসির দড়িতে ছটফট করছে। তার বড় বোন তৎক্ষনাত তার পরিবারের সবাই কে ডাক দেয় এবং তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচায়।
পরে পরিবারের লোকজন তার পকেট থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করে। সেই ‘চিরকুট’ এ মাহফুজ লিখেছে “আমার মৃত্যুর জন্য তুষভান্ডার আর.এম.এম.পি. সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের হেড স্যার দায়ী। ইতি: মাহফুজ হাসান, ০৬/০৮/২০১৮ইং ” আরেক অংশে লিখেছে “ উপজেলা চেয়ারম্যান স্যার আমার জন্য সুপারিশ করেছিল। দোয়া করি আল্লাহ যেন তাকে সুস্থ রাখেন। ইতি: মাহফুজ হাসান,০৬/০৮/২০১৮ ইং।”
এব্যাপারে তুষভান্ডার আর এম এম পি সরকারি উচ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নলনী কান্ত রায়ের সাথে তাঁর কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে গেলে তিনি মাহফুজ সম্পর্কে কোন রকম তথ্য দিতে রাজি হননি। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন দেশে এ ধারণের মৃত্যু অনেক ঘটে। তাতে শিক্ষকের কিছু হয়নি। এমনকি সংবাদ কর্মীদের চরিত্র নিয়েও তিনি বিরূপ মন্তব্য করেন।
এ সময় বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু সাঈদ মন্ডল কক্ষে এসে প্রধান শিক্ষকের গুণ-কীর্ত্তনে অতি উৎসাহী হয়ে উঠেন। তিনি বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যানের কোন সুপারিশ কাজ হবে না। ‘আমাদের প্রধান শিক্ষকের মতো সৎ শিক্ষক উপজেলায় দ্বিতীয়টি নেই। তিনি এমনও বলেন উপজেলার সব কর্মকর্তা ঘুষ খোর।
নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, ‘স্যারদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে বিদ্যালয়ের স্যাররা পরীক্ষায় নম্বর কম দেয়, পরীক্ষায় ফেল করার ভয় দেখানো হয়। আবার টাকা দিলে কম নম্বর শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করার সুযাগ করে দেয়া হয়। এমন কিছু নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাধিক প্রধান শিক্ষক একই কথা বলেন।
ঐ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি উপজলা নির্বাহী অফিসার রবিউল হাসান বলেন, কোন শিক্ষার্থী যদি ৫ বিষয়ে ফেল করে,তাকে সঙ্গত কারণে জেএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহনের সুযাগ দেয়াটা ঠিক হবেনা।’
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আজিজুল ইসলাম জানান ‘জেএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে কাউকে বাদ দেয়ার এমন কোন বিধি বিধান আছে বলে আমার জানা নাই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap
%d bloggers like this: