আজ : ১৬ই মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, সোমবার প্রকাশ করা : মে ৭, ২০২২

  • কোন মন্তব্য নেই

    জীবন নদীর তীরে; আবু আককাস আহমেদ

    (১)

    পেশাজীবী হিসেবে গোয়েন্দাজীবন বেশ রোমাঞ্চকর! ‘গোয়েন্দা’ শব্দটা বলার সাথে সাথে একটা রহস্য; গা ছমছম অনুভব এবং আতঙ্ক এসে হাজির হয়। সমাজ-সংসারে গোয়েন্দাদের কখনো কখনো সমীহ আবার কখনো কখনো অসহযোগিতাও করা হয়। সত্য আবিষ্কারের অনিবার্য দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে গোয়েন্দাকে হাঁড়ির খবরও জানতে হয়। খবর দিয়ে খবরের সন্ধান-এই হচ্ছে পেশা। অনেক ঝুঁকি এই পেশায়। কিন্তু সত্য সন্ধ্যানের দায়িত্বে একজন গোয়েন্দা নিবিষ্ট আন্তরিকতায় কাজ করে যান।

    ছোট বেলায় গোয়েন্দা কাহিনি, রহস্যাপন্যাস-থিলার সবার প্রিয়। শৈশব-কৈশোর-যৌবনে আমরা প্রচণ্ড উৎসাহী হয়ে সে সব বই পড়ি। পাঠ্যপুস্তক দূরে রেখে রাত জেগে সে সব বই পড়ে আমরা রোমাঞ্চি ত হয়েছি। দুস্যু মোহন সিরিজের কল্পকাহিনির লেখক শশধর দও দিয়ে আমাদের শুরু। একটু বয়স হওয়ার পর আগাথা ক্রিস্টির গোয়েন্দা উপন্যাস পড়তে পড়তে কখনো কখনো আমরা নিজেদেরকে সেইসব বইয়ের নায়কদেরকেই আর্দশ মনে করতাম। কখনো কখনো বাংলাদেশের বোমেনা আদাদের প্রতিও আমরা আসক্ত হয়েছি। মনে করতাম আমি জেমসবন্ড, কিরিটি রায়, কিস্তা, ফেলুদা। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ হওয়ার পর মাসুদ রানাও কম আগ্রহের সৃষ্টি করেনি তরুণ মনে। মাসুদ রানার দারুণ সব সফল অভিযানে রোমাঞ্চিত হয়েছি। কিশোর বয়সের সেই গোয়েন্দা প্রীতি থেকে গোয়েন্দা জীবন সম্পর্কে যে দুর্বলতা ও আবেগ মনের ভিতরে বাসা বেঁধেছিলো, পেশা জীবনে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত কর্মকর্তা হওয়ার সুযোগ পেয়ে যেন ‘সাপে বর’ হলো। আন্তরিকতার সাথে সে জীবনের কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন করে দেশের সেবা করতে পেরেছি বলেই মনে করি। একদিকে গোয়েন্দা অভিযানের রোমা , অন্যদিকে দেশ সেবার আর্দশ বাস্তবায়নে যেন জীবন সার্থক হয়েছে আমার।

    (২)

    আমি হতে চেয়েছিলাম ডাক্তার। অসুখে-বিসুখে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবার ইচ্ছা ও আর্দশ মনের কোনে লালন করতাম। আমার স্নেহময়ী মাও বলতেন, ‘অসুখে-বিসুখে মানুষ কতো কষ্ট করে। গরীব মানুষের তো চিকিৎসার করার মতো টাকা পয়সাও থাকে না। গ্রামে-গঞ্জে কতো মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। বাবা তুমি ডাক্তারি পড়াশুনা করে বড় ডাক্তার হও। গরীবের দুঃখে সাহায্য সহযোগিতার ব্রত নিয়ে মানুষের পাশে থেকো। এটাই আমার শেষ ইচ্ছা।’ কিন্তু বিধি বাম। মানুষ চায় একটা আর পরম করুণাময় চান অন্যটা। মানুষের বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবটাই আল্লাহ হাতে। আমিও সেই বিধির বিধানেই আমার নিজের ও পরিবারের ইচ্ছা পূরণ করতে পারিনি। শতচেষ্টা করেও মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধে আমি ছিলাম টাইগার কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্য। দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হয়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আর্দশের সৈনিক হিসাবে ছাত্র রাজনীতির সাথে একাত্ব হয়ে যাই। তখন থেকে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে জীবনাপাত করার শপথ নেই। কিন্তু আমাদের চোখের সামনে নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর হতাশায় হতবাক হয়ে যাই। জাতির এহেন কলঙ্ককজনক কর্মে বিমূঢ় ও দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ি।

    (৩)

    ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের অনুষ্ঠানকে সুন্দর, সুষ্ঠু ও নিরাপদ ভাবে সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে গঠন করা হয় ৪৬ টি সেচ্ছাসেবক দল। হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকার সুবাদে একটি সেচ্ছাসেবক দলের দায়িত্ব ছিল আমার উপর। রাতভর চলে আমাদের প্রস্তুতি। আমার রুমে শোবার জায়গা না থাকায় আমি ও আজিজ ভাই (অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার) রাত ২ টায় চলে গেলাম পাশের রুমে। আমাদের দুর্ভাগ্য কিছুতেই বাংলাদেশের ইতিহাসকে কলঙ্কমুক্ত রাখা গেলো না। আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকা অবস্থায় গুলির শব্দ শুনি। আমার মনে হচ্ছিল জাসদের গণবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে না দেয়ার যড়যন্ত্র করছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কালো অধ্যায় রচিত হলো ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট। ঠিক সেই সময় রেডিওতে এক নরাধম হত্যাকারীর স্বগর্ব ঘোষণা শুনাল আজিজ ভাই। সে ঘটনার সময় সমগ্র জাতির মতো স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত লক্ষাধিক মুক্তিযোদ্ধাদের ও কিছুই করার ছিল না। মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে নিস্প্রভ হয়ে এলো বিজয়ের আলো। বিলম্বে হলেও বঙ্গবন্ধু হত্যার রায় কার্যকর হয়েছে। হত্যাকারীদের ফাঁসি হয়েছে।

    (৪)

    একপর্যায়ে রাজনীতি থেকে দূরে ছিটকে পড়ে একজন মধ্যবিত্ত মানুষের মানসিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ি আমি। দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধার হৃদয়ের আগুন হতাশায় ম্রিয়মান হয়ে আসে। নিজের জীবন ধারণের জন্যে একটা চাকুরি খোঁজতে থাকি। সেই চাকুরি খোঁজার প্রক্রিয়ায় আমার জীবন যে ঘাটে এসে নোঙর করে তার নাম শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এই অধিদপ্তরের ‘শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত কর্মকর্তার’ চাকুরি পাই। এই চাকুরির ‘গোয়েন্দা’ শব্দটি আমাকে কৈশোর-যৌবনের স্বপ্নের রাজ্যে নিয়ে যায়। শুরু করি এই রোমা কর পেশার চ্যালেঞ্জের চাকুরি।

    (৫)

    মুক্তিযুদ্ধে আমারা পুরো পরিবার অংশ নিয়েছিলাম। আমার মা ছিলেন দৃঢ় ও সাহসি ব্যক্তিত্বের মানুষ। আম্মা আমাদের সব ভাইদের নির্ভয়ে যুদ্ধে পাঠিয়ে ছিলেন। আম্মার চরিত্রটা আমি ঠিক ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। শহিদ আজাদ কিংবা শহিদ রুমির মতো আমার আম্মাও ছিলেন সাহসী ও যুদ্ধে যাবার অনুপ্রেরণার উৎস।

    এমন এক পরিবারের সন্তান হিসাবে আমি যেমন নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি সাথে সাথে খুবই গর্ব অনুভব করি। কেননা হাজার বছরের জাতির ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের যে মহাকাল আসে, আমরা ছিলাম সেই মহাকালের সূর্যসন্তান। তেজদীপ্ত, দুঃসাহসী এবং দেশপ্রেমে দুর্নীবার। আমরা ছয় ভাইয়ের মধ্যে চার ভাই ই সেই মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিলাম। আমরা ভারতের তুরা ট্রেনিং ক্যাম্পের প্রথম ব্যাচের গেরিলা ট্রেনিং নিয়েছিলাম। বাংলাদেশে প্রথম ক্যাম্প অফিস ছিলো আমাদের গ্রামের বাড়িতে। এমন কি আমার বয়োবৃদ্ধ মা ও সীমান্তে ওপারে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বাকী দুই ভাই অল্প বয়সের কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে পারেনি। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের গ্রামের বাড়ি অগ্নি সংযোগ করে পুড়িয়ে দেয়। আমরা পুরো পরিবার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেই। এই অংশ গ্রহণের সুযোগ ও সুযোগ গ্রহণের সাহসকেই আমি বিরল সম্মানের বলে মনে করি। এক পরিবারের ৫ পাঁচ জন মুক্তিযোদ্ধা। এই বিরল পারিবারিক গৌরব আমাদের প্রিয় দেশ ও সমাজে আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার অধিকার দিয়েছে। আরো গৌরবের আমরা চার ভাই অস্ত্র হাতে, গেনেড হাতে, বিস্ফোরক দ্রব্যাদি নিয়ে বিভিন্ন সফল অভিযানে অংশ নিয়েছি। আর আমার বড় ভাই আবু সিদ্দিক আহমেদ ছিলেন আমাদের সকল সফল অভিযানের দুঃসাহসিক কমান্ডার। মুক্তিযুদ্ধের সময় নেত্রকোণা কিশোরগঞ্জ এলাকায় তাঁর নামে সিদ্দিক বাহিনী সংগঠিত হয়েছিল। এলাকায় দুঃসাহসী মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার হিসেবে তিনি টাইগার সিদ্দিক নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। নেত্রকোণা মুক্তকরার যুদ্ধে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি নেতৃত্ব দেন। আমাদের কভারেজ দল হিসেবে আনোয়ার মাস্টার কম্পানী নেতৃত্ব দেন। সে যুদ্ধে টাইগার কম্পানীর কমান্ডার সিদ্দিক সম্মুখযুদ্ধে গুলিবৃদ্ধ হন।

    (৬)

    টাইগার কম্পানীর তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধা যথাক্রমে আবু খাঁ, আব্দুস সাত্তার, ও আব্দুর রশিদ শহীদ হন। আমার মুক্তিযোদ্ধা মা বলতেন, ‘তোরা আমার চার মুক্তিযোদ্ধা সন্তান। তোদের জন্মদাত্রী হিসেবে আমি গর্বিত। তবে মা হিসাবে তার চেয়েও বেশি গর্ব অনুভব করি যখন বাংলাদেশের সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসাবে নিজের হৃদয় উজাড় করে সকলকে সমানভাবে ভালোবাসতে, স্নেহ করতে, তাদের সকলের মঙ্গলের জন্যে নামাজ, রোজা শেষে দোয়া করতে পারি।’ এক সময় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি সত্য, কিন্তু আদর্শ থেকে বিচ্যুত হইনি কখনো। হৃদয়ে জাগরুক ছিলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। চাকুিরতে থাকাকালেই মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, তার স্বাধীনতার ঘোযণা নিয়ে একাধিক গবেষণামূলক রচনা লিখে তা বই আকারে প্রকাশনা করেছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী সরকারের রক্তচক্ষুকে ভয় পাইনি। চাকুিরতে এসে অর্জন করেছি বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা। দেখেছি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশের এককদল আওয়ামীলীগ দীর্ঘ একুশ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে পুনরায় ক্ষমতাসীন হলেও প্রশাসনে কিভাবে ঘাপটি মেরে বসে ছিলো স্বাধীনতা বিরোধী জামাত শিবির চক্র। আমাদের অধিদপ্তরের নিরন্তা এন.বি আর অর্থাৎ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এর প্রধান হয়ে এলেন শাহ আব্দুল হান্নান। স্বাধীনতা বিরোধী জামাত শিবির চক্রের সমর্থক। আমাকে দিয়ে জামাত শিবির চক্রের একটি সংগঠনকে বড় অংকের টাকা সংগ্রহ করে দেয়ার জন্যে আমার উপর বার বার চাপ সৃষ্টি করেন তিনি। কিন্তু আমাকে কিছুতেই নতি স্বীকার করাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি আমার চাকুরিতে আঘাত করেন। সাময়িক বরখাস্তের শিকার হই আমি। মনগড়া আক্রোশজনিত মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগের প্রতিবাদে সুপ্রীম কোর্টের মাননীয় হাইকোটে বিভাগে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ স্থগিত চেয়ে ও অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে রীট আবেদন করি। মহামান্য হাইকোর্ট আবেদনটি গ্রহণ করে স্থগিতাদেশ নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তে আমি নিদোষ প্রমাণিত হই। প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্ছ ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায়ের পথে স্বাধীনতা বিরোধীদের আজ্ঞাবহ না হওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। আর এ সাহস ও দৃঢ়তা পেয়েছি মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করেই।

    (৭)

    তেত্রিশ বছর সরকারি চাকুরি করে এখন অবসর জীবনযাপন করছি। শুধু চাকুরি করার মানসিকতা নিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত বিভাগে কাজ করিনি। এর মধ্যে ছিলো দেশ প্রেম, দায়িত্ববোধ। সে দায়িত্ববোধ থেকেই দেশের কোন ক্ষতি হবে এমন কাজ করিনি। অথচ চাকুরিটাই ছিলো তেমন আশঙ্কায় পরিপূর্ণ। চোরাচালান ঠেকানোর কাজে ছাড় দেয়ায় থাকে নানা প্রলোভন। অনেক সহকর্মী ব্যক্তিগত লোভ লালসা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারে না। আমি দেশের স্বার্থের কথা চিন্তা করে কোন লোভ কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে উর্ধতন কর্মকর্তার অন্যায় নির্দেশের কাছেও মাথা নত করিনি। আমার চাকুরি যার অঙুলি নির্দেশে চলে যেতে পারে তিনি হচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। আমি একবার সেই অর্থমন্ত্রীর ছেলেকেও ছাড় দেইনি। আমার উর্ধতন কর্মকর্তারা নানা রকম ভয় দেখিয়েও আমাকে নিবৃত্ত করতে পারেন নি। অর্থমন্ত্রীর ছেলের বড় ধরণের মিথ্যা ঘোষণার চোরাচালান পণ্য ঠেকিয়ে দিয়েছি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অভিযান চালিয়ে অবৈধ আমদানীকৃত পণ্য আটক করেছি। এবং তা জব্দ করে সরকারের কোটি কোটি টাকার পতিত রাজস্ব রক্ষা করেছি।

    (৮)

    মনে পড়ে চাকুরির প্রথম পোস্টিং হয় চট্টগ্রামে। কাজে যোগদান করার পর কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা বড় ধরণের চোরাচালানের খবর পেলাম। সহকর্মীরা অধিকাংশই পুরানো এবং অভিজ্ঞ। কোন রাঘব বোয়াল এর সাথে জড়িতÑতা হয়তো তারা অনুমান করতে পেরেছিলেন। চোরাচালান প্রতিরোধকারী সংস্থার সদস্যদের কাউকে কাউকে টাকা পয়সা দিয়ে ম্যানেজ করেই তারা এমন কাজ করে। হয়তো বা এ জন্যেই সহকর্মীরা অপারেশনে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তরুণ বয়সের গরম রক্ত আরো গরম হয়ে গেলো। আমি অপারেশনে যেতে স্থির প্রতিজ্ঞ। অবশেষে চলে গেলাম। আমরাতো নিরস্ত্র। তাই চিন্তা করে রিজার্ভ পুলিশ থেকে রিকুইজিশন দিয়ে এক সেকশন পুলিশ সাথে নিয়ে গেলাম। চোরাচালানের পণ্যবাহী ট্রলারের কাছাকাছি গিয়ে আমি পুলিশকে ফাঁকা গুলি করতে বললাম। পুলিশ ফাঁকাগুলি করার পর আমি মিথ্যা-মিথ্যি চিৎকার করতে থাকলাম। চোরাচালানিরা গুলি করেছে। আমার চিৎকার ও গুলির শব্দে চোরাচালানি দলটি কালাপুল খালের পাড়ে ট্রলারটি ভিড়িয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলো। আমাদের শুল্ক বিভাগের সিপাই ও পুলিশের কনস্টোবলরা দৌড়ে গিয়ে পাঁচজন চোরাচালানিকে ধরতে সামর্থ হলো। আমরা পাঁচজন চোরাচালানিকে গ্রেফতার ও ট্রলারসহ মালামাল আটক করি। চোরাকারবারিদের থানায় সোপর্দ করে মামলা রজু করি।

    (৯)

    মার্শাল ল কোর্টে চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে মামলাটি ট্রায়াল হয়ে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় এবং আটককৃত মালামাল রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়। চাকুরির প্রথম দিকে এমন একটি সাফল্যে আমি যেমন উৎফুল্ল হই তেমনি আমার মনোবলও বেড়ে যায়। ডিপার্টমেন্টয়েও আমার গুরুত্ব বেড়ে গেলো। তবে বুঝতে পারলাম, যে চাকুরি ভাগ্যে জুটেছে তা যুদ্ধের মতোই কঠিন। তারপর নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রশাসনের কাছে রিভলবারে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করি। চাকুরি জীবনে শেষদিকে আরো একটি মনে রাখার মতো চোরাচালানের একটি নিরাপদ কৌশলকে প্রতিহত করতে সামর্থ হই। তা হলো কুটনৈতিকদের আমদানীকৃত চালানে শতভাগ বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে আসা। ভিয়েনা কনভেশন অনুযায়ী কুটনৈতিক আমদানী পণ্য বা পাউন্ড শুল্ক বিভাগ কর্তৃক তল্লাসী করা যায় না। আমদানীকৃত পাউন্ড কন্টিনারের সীল সঠিক আছে কিনা তা পরিদর্শন করেই শুল্ক স্টেশান বা জেটি থেকে পণ্য চালানটি খালাস দিতে হয়। কুটনৈতিক সুযোগের অপব্যবহার করে চোরাচালানি একটি চক্র বেশ কিছুদিন থেকে কুটনৈতিক সীল ব্যবহার করে অবৈধভাবে পণ্য আমদানী করে আসছে। ঘটনাটি ঘটেছে গুলশানে আবাসিক অভিজাত এলাকায়। কুটনৈতিক পাড়া হিসাবে এখানে চোরাচালানের মতো দেশদ্রোহী কাজে কেউ জড়িত থাকবে তাও কল্পনা করা যায় না। আমিই প্রথম সেখানে চোরাচালানীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করি এবং সফল হই। তখন বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে ইরাকের অবস্থা বিপর্যস্ত। ঢাকাস্থ দূতাবাসের লোকদের বেতন নেই। দূতাবাস চালাবার খরচও তারা পায় না। সে পরিস্থিতিতে দূতাবাসের লোকেরা কুটনৈতিক সীল ব্যবহার করে কাস্টমসের বিনা তল্লাসিতে অবৈধ পণ্য আমদানীর মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে আমি গুলশানের সেই বাড়িতে অভিযান চালাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। উর্ধতন কতৃপক্ষ ভয় পেয়ে গেলেন। কিন্তু কোন কিছুই আমাকে থামাতে পারলো না। আমার একাগ্রতা ও গোয়েন্দা তথ্যের নিশ্চয়তা পেয়ে অবশেষে অভিযান চালাবার অনুমতি পেলাম। আমি অভিযান চালিয়ে সফল হলাম। জব্দ করলাম বিপুল পরিমাণ আমদানী নিষিদ্ধ বিদেশি সিগারেট, বিভিন্ন ব্রান্ডের মদ এবং নগদ অর্থ। যা সবই অবৈধ। গাড়িটিতে অভিযান চালাতে প্রথমে আমিও দ্বিধাগ্রস্থ ছিলাম এ জন্যে যে, খবর নিয়ে জানা যায় এই বাড়িটির মালিক ছিলেন বাংলাদেশের খুবই বিশিষ্ট ব্যক্তি। অনেক নিশ্চিত হয়ে শিক্ষাবদ-বিজ্ঞানী ড. কুদরত-এ-খুদার বাড়িতেই আমি অভিযান চালাই। তাঁর মৃতে্যুর পর ছেলেরা ব্যবসায়ীর কাছে তা ভাড়া দেয়। একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে কোন ব্যবসায়ী যদি সেই বাড়িটিতে চোরাচালানের গুদাম বানায় তাহলে বাড়ির মালিকের কোন দায়িত্ব থাকে না। উর্ধতন কতৃপক্ষের সাথে পরামর্শ করে শেষ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে দিলাম। স্কুল জীবন শেষে কিশোর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। যৌবনে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক ছিলাম। পরে তেত্রিশ বছর সরকারী চাকুরী করেছি। জীবনের এই তিন পরেই আমি দেশের জন্যে কিছু করার চেষ্টা করেছি। এখনো জীবনযুদ্ধে জড়িত ব্যক্তিদের সাথে থাকতে ভালোবাসি। অসহায়দের পাশে থাকতে চেষ্টা করি। জনসেবাই মানবধর্মের শ্রেষ্ঠ পুণ্য। আমার বিশ্বাস ন্যায় নৈতিকতাই জীবন। পরমকরুণাময় আল্লাহ যেন বাকী জীবনটাও দেশ, জাতি এবং মানুষের মঙ্গল কাজে ব্যয় করে শেষ করতে পারি সেই সুযোগ দেন।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published.